রক্তের বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার এর কথা আমরা জানি। তবে এর মধ্যে বিভিন্ন রকমের লিউকেমিয়া সম্পর্কেই বেশি আলোচনা হয়। এছাড়া লিম্ফোমা সম্পর্কেও আলোচনা হয়। কিন্ত মাল্টিপল মায়েলোমা সম্পর্কে আমাদের তেমন একটা ভালো ধারনা নেই বললেই চলে।কারণ মাল্টিপল মায়োলেমা বিরল প্রকৃতির একটি রক্তের ক্যান্সার।প্রকৃতপক্ষে এটি রক্তের প্লাজমা কোষের ক্যান্সার।
শ্বেত রক্ত কণিকার একটি ধরণ হলো প্লাজমা কোষ। যা শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। মাল্টিপল মায়েলোমাতে অস্থিমজ্জা (Bone marrow) বেশি বেশি প্লাজমা কোষ তৈরি করে। ফলে অন্যান্য রক্তকোষের স্বাভাবিক উৎপাদন হ্রাস পায়। এতে রক্তে লোহিত কণিকা ও অণুচক্রিকার পরিমান কমে যেতে থাকে।
প্লাজমা কোষ স্বাভাবিক অবস্থায় অ্যান্টিবডি তৈরি করে যা আমাদের শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।মাল্টিপল মায়েলোমায়, অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষ (মায়েলোমা কোষ) অস্থিমজ্জাতে জমা হয় এবং টিউমার তৈরি করে। স্বাস্থ্যকর অ্যান্টিবডি তৈরির পরিবর্তে ক্যান্সার কোষগুলো (মায়েলোমা কোষ) অস্বাভাবিক প্রোটিন তৈরি করে, যা বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি পারে।
মূলত এই অবস্থাকেই মাল্টিপল মায়েলোমা বলা হয়।
মাল্টিপল মায়েলোমার লক্ষণ
মাল্টিপল মায়েলোমার লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
- হাড়ের ব্যথা, বিশেষ করে মেরুদণ্ডে ব্যথা :
- ক্লান্তি
- দুর্বলতা
- ওজন কমে যাওয়া
- বারবার সংক্রমণ: বারবার শ্বাসনালিতে সংক্রমণ এবং জ্বর আসা এই রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
- হাড়ের ক্ষয়: রোগের অগ্রবর্তী পর্যায়ে হাড়ের ক্ষয় বাড়তে থাকে। তখন হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়। অনেক সময় নিজে নিজে বা সামান্য চাপে হাড় ভেঙেও যেতে পারে। মেরুদণ্ডের হাড়ের পাশাপাশি এই রোগ কখনো কখনো স্পাইনাল কর্ডকেও আক্রান্ত করে, যার ফলে অনেক সময় রোগীদের পা প্যারালাইজড হয়ে অসাড় হয়ে যেতে পারে।
- রক্তাল্পতা
- কিডনির সমস্যা: কিডনি আক্রান্ত হওয়া এই রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ ও জটিলতা। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিডনি কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে। অনেক সময় কিডনি সম্পূর্ণ বিকলও হয়ে যেতে পারে।
- অস্বাভাবিক রক্তপাত
- হাইপারক্যালসেমিয়া (রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেশি হওয়া):রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে রোগীর শরীরে অস্থিরতা, মাথা ব্যথা, মাত্রাতিরিক্ত পিপাসা, অবচেতন বা অচেতন হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ করা ইত্যাদি সমস্যাও দেখা দেয়।
মাল্টিপল মায়েলোমা কেন হয়?

এর সঠিক কারণ সম্পর্কে এখনও ভালোমত জানা যায় নি। তবে, কিছু ঝুঁকির কারণগুলির মধ্যে রয়েছে:
- বয়স (৬০ – ৬৫ বছরের বেশি বয়সী লোকদের মধ্যে বেশি দেখা যায়)
- পুরুষ (নারীদের তুলনায় পুরুষদের এই রোগের ঝুকি বেশি)
- কৃষ্ণাঙ্গ
- পারিবারিক ইতিহাস
- কিছু জিনগত পরিবর্তন
রোগ নির্ণয়
মাল্টিপল মায়েলোমা সন্দেহ হলে রক্তের রুটিন পরীক্ষার পাশাপাশি আরোও বেশ কিছু পরীক্ষা করা হয়। এগুলো হলো:
- সিরাম ক্রিয়েটিনিন,
- রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা,
- প্রস্রাবে বেনজোন্স প্রোটিন,
- রক্তের প্রোটিন ইলেকট্রোফোরেসিস,
- বোন ম্যারো পরীক্ষা,
- মাথার খুলির হাড়ের এক্স-রে,
- মেরুদণ্ডের সিটি স্ক্যান ও এমআরআই ইত্যাদি
এসব পরীক্ষা দেখে রক্তে ও মজ্জায় অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষ ও অস্বাভাবিক মায়েলোমা প্রোটিনের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। রোগের ধরন ও মাত্রা বুঝতে ইমিউনোফিক্সেসন, ইমিউনোফেনোটাইপ, সাইটোজেনেটিক ইত্যাদি পরীক্ষাও করা হয়।
পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মাল্টিপল মায়েলোমার স্টেজ, টাইপ ইত্যাদি নির্ণয় করলে সঠিক চিকিৎসার প্রটোকল নির্ণয় এবং কোন মাত্রার ওষুধ কতটা কাজ করবে সেটা নির্ণয় করা সহজ হয়।
মাল্টিপল মায়েলোমার চিকিৎসা:

রোগটির চিকিৎসা রোগের অগ্রগতি এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। চিকিৎসার বিকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে:
- কেমোথেরাপি: ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার জন্য ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
- টারগেটেড থেরাপি: ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি এবং বিস্তারকে বাধা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
- ইমিউনথেরাপি: রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করার জন্য ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
- স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট: রোগীর অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করতে স্বাস্থ্যকর স্টেম কোষ ব্যবহার করা হয়।
মাল্টিপল মায়েলোমা প্রতিরোধে করনীয়:
এই রোগ প্রতিরোধের কোন নিশ্চিত উপায় নেই। তবে, কিছু বিষয় ঝুঁকির কারণ কমাতে সাহায্য করতে পারে:
- স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া
- নিয়মিত ব্যায়াম করা
- ধূমপান ত্যাগ করা
- অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করা এড়ানো
This article is written with the help of Gemini.