আঙ্গুর ফল:
সব ফলের মধ্যে আঙ্গুর ফল একটু অভিজাত বলেই গণ্য করা হয়।আঙ্গুর ফলের ইংরেজি নাম গ্র্যাপস (Grapes)। আঙুর স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। কেননা ছোট এ রসালো ফলটিতে আছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, খনিজ ও ভিটামিন—যা স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য বেশ উপকারী। সুস্বাদু এ ফলের আছে বিভিন্ন খাদ্য ও ভেষজ গুণ। সুস্বাদু এই আঙ্গুর ফল দিয়ে ওয়াইন, রস, এবং জেলি-জ্যাম ইত্যাদি তৈরি করা ছাড়াও বাইরের বিভিন্ন দেশের নানারকম মুখরোচক রান্নায় এর ব্যবহার করা হয়। আর আঙ্গুর শুকিয়ে হয় কিশমিশ, যা ছাড়া আপনার শখের খাবারগুলো একদমই বেমানান।
আঙ্গুরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন। এগুলির মধ্যে রয়েছে বি১, সি, কে ভিটামিন অন্যতম। এছাড়াও আছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পটাশিয়াম ও খনিজ পদার্থ ম্যাঙ্গানিস। আঙ্গুর শুকিয়ে সাধারণত যে কিশমিশ তৈরি হয় তাতে রয়েছে ৬০ শতাংশ ফ্রুকটোজ। আঙুর কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা ও হৃদরোগের মতো রোগ প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
আঙুরের বীজ ও খোসায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা বার্ধক্য রোধে কাজ করে। যাঁরা রক্ত সঞ্চালনের ভারসাম্যহীনতায় ভোগেন, তাঁদের জন্য আঙুরের জুস খুবই উপকারী। আঙুরের ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের সহায়ক ও ইনসুলিন বৃদ্ধি করে। আঙুরের জুসে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিইনফ্লামিটরির মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, যা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রদাহ দূর করে। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, ডায়রিয়া, ত্বক ও মাইগ্রেনের সমস্যা দূর করতেও আঙুর সহায়তা করে।
আঙ্গুর ফল এর পুষ্টিগুণ:

আঙ্গুর একটি পুষ্টিকর ফল যা ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। এটি বিভিন্ন রঙে পাওয়া যায়, যেমন লাল, সবুজ এবং কালো। আঙ্গুরের পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ প্রতি ১০০ গ্রামে নিম্নরূপ:
- ক্যালোরি: ৬৯
- কার্বোহাইড্রেট: ১৮ গ্রাম
- ফাইবার: ১.১ গ্রাম
- চিনি: ১৬ গ্রাম
- প্রোটিন: ১.০ গ্রাম
- ভিটামিন সি: ১৮ মিলিগ্রাম
- ভিটামিন কে: ২০ মাইক্রোগ্রাম
- পটাশিয়াম: ১৯৫ মিলিগ্রাম
- ক্যালসিয়াম: ১৫ মিলিগ্রাম
- ম্যাগনেসিয়াম: ১৫ মিলিগ্রাম
- ফসফরাস: ১০ মিলিগ্রাম
- আয়রন: ১ মিলিগ্রাম
আঙ্গুরের পুষ্টি উপাদানগুলি বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রদান করে। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে, ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে, দৃষ্টিশক্তির উন্নতি করতে, ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে, ওজন কমাতে সাহায্য করতে, শক্তির মাত্রা বাড়াতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে।
আঙ্গুর ফল এর উপকারিতা:

১. কিডনি সুস্থ রাখতে আঙ্গুর:
আঙ্গুরের সব ভিটামিন উপাদানগুলো ক্ষতিকারক ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা সহনশীল অবস্থায় রাখে। সেই সঙ্গে আমাদের কিডনির রোগ-ব্যাধির বিরুদ্ধেও কাজ করে আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে।
২. ত্বককে সুরক্ষিত রাখে আঙ্গুর:
আঙ্গুরে মধ্যে উপস্থিত ফাইটো কেমিক্যাল ও ফাইটো নিউট্রিয়েন্ট আমাদের ত্বকের সুরক্ষায় বিশেষ কাজ করে। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। এটি আমাদের ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে বিশেষ অবদান রাখে।
৩. ক্যান্সার নিরাময়ে আঙ্গুর:
আঙ্গুর আমরা জুস করেও খেয়ে থাকি। আঙ্গুরের এই জুসে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিইনফ্লামেটরির মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, যা আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রদাহ দূর করে থাকে। সাধারণত এই প্রদাহ ক্যান্সার রোগ জন্মের অন্যতম প্রধান কারণ।
৪. বয়সের তারুণ্য ধরে রাখতে আঙ্গুর:
আমাদের শরীরের ফ্রি রেডিকেলস ত্বকে বলিরেখা ফেলে দেয়। আঙ্গুরে মধ্যে উপস্থিত ভিটামিন সি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এই ফ্রি রেডিকেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমাদের ত্বক ঠিক রাখে এবং শরীরে বয়সের ছাপ পড়া প্রতিরোধ করে।
৫. কোলস্টেরল কমাতে আঙ্গুর:
রক্তে কোলস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে আঙ্গুর। এতে টরোস্টেলবেন নামে এক ধরনের যৌগ থাকে যা কোলস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
৬. নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে আঙ্গুর:
সাধারণত যারা রক্ত সঞ্চালনের ভারসাম্যহীনতায় ভোগেন বিশেষ করে তাদের জন্য আঙ্গুরের জুস খুবই দরকারী। আঙ্গুরে মধ্যে থাকা ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস, যা আমাদের শরীরে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনে সহায়ক ও ইনসুলিন বৃদ্ধি করে থাকে।
৭. অ্যাজমা প্রতিরোধ করে আঙ্গুর:
আঙ্গুরের ঔষধি গুণের কারণে এটি অ্যাজমার ঝুঁকি থেকে আপনাকে রক্ষা করবে। ফুসফুসে আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়িয়ে তােলে এই ফলটি।
৮. ভুলে যাওয়া রোগ নিরাময়ে আঙ্গুর:
আমরা স্বভাবতই অনেকেই ছোট ছোট বিষয়গুলো খুব দ্রুত ভুলে যায়। আবার দেখা যায় কোনো কথা হঠাৎ করেই স্মৃতি থেকে মুছে যায়। এটি সত্যিকার অর্থে এক ধরনের রোগ। এই ভুলে যাওয়া রোগটি নিরাময়ে আঙ্গুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরোও পড়ুন
ডাবের পানির এত্তগুলো উপকারিতা ! জানলে অবাক হবেন আপনিও।
৯. চুলের যত্নে আঙ্গুর:
দিঘল চুল একটু অযত্নেই খুশকিতে ভরে যায় । এছাড়াও দেখা যায় চুলের আগা ফেটে গিয়ে রুক্ষ হয়ে পড়ে, ধূসর রঙের হয়ে যায় এবং শেষমেশ চুল ঝরতে থাকে। এইসব সমস্যার সমাধানে আপনি আঙ্গুর খেতে পারেন।
১০. স্তন ক্যান্সার নির্মূল করতে সাহায্য করে আঙ্গুর:
যেসব নারীরা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে আছেন তারা নিয়মিত আঙ্গুর খেতে পারেন। কেননা গবেষণায় দেখা গেছে আঙ্গুরের উপাদানগুলো স্তন ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষের বিরুদ্ধে কাজ করতে পুরোপুরি সক্ষম।
১১. চোখের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আঙ্গুর:
আঙ্গুরে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ থাকে। ভিটামিন এ চোখের জন্য সত্যিই উপকারী। এছাড়াও এর মধ্যে রয়েছে অন্যান্য জরুরি উপাদান যা চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারে। তাই চোখের সমস্যা থাকা মানুষের নিয়মিত এই ফল খাওয়া উচিত।
১২. বদহজম দূর করতে সাহায্য করে আঙ্গুর:
যদি নিয়মিত আঙ্গুর খাওয়া হয় তাহলে বদহজম অনেকাংশে কমে যায়। অগ্নিমন্দ্যা দূর করতেও আঙ্গুর অনেক বেশি কার্যকর।
আঙ্গুরের অপকারিতা:

আঙ্গুর একটি পুষ্টিকর ফল যাতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এটি স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী, তবে এর কিছু অস্বস্তিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে।
আঙ্গুরের অস্বস্তিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে রয়েছে:
- অ্যালার্জি: কিছু লোকের আঙ্গুর খেলে অ্যালার্জি হতে পারে। অ্যালার্জির লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে চুলকানি, ফোলাভাব, লালভাব, শ্বাসকষ্ট এবং বমি বমি ভাব।
- ডায়রিয়া: আঙ্গুরতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে, যা ডায়রিয়া হতে পারে। বিশেষ করে, যদি আপনি প্রচুর পরিমাণে আঙ্গুর খান।
- গ্যাস এবং কোষ্ঠকাঠিন্য: আঙ্গুরতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে, যা গ্যাস এবং কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।
- দাঁতের ক্ষয়: আঙ্গুরতে চিনি রয়েছে, যা দাঁতের ক্ষয় হতে পারে। তাই আঙ্গুর খাওয়ার পরে দাঁত ব্রাশ করা গুরুত্বপূর্ণ।
- ওজন বৃদ্ধি: আঙ্গুরতে ক্যালোরি রয়েছে, তাই যদি আপনি ওজন কমাতে চান তবে এটি সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
যদি আপনি আঙ্গুরের কোনও অস্বস্তিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনুভব করেন তবে এটি খাওয়া বন্ধ করা উচিত।